
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাঃ শিক্ষা ক্যাডারদের বদলি বাণিজ্যের প্রধান হোতা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের যুগ্মসচিব মোঃ নুরুজ্জামানকে বদলি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
মঙ্গলবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মিঞা মুহাম্মদ আশরাফ রেজা ফরিদী স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে তাকে প্রাণি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়। আগামী ১৭ মার্চ ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে তিনি বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত হতে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
এর আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই যুগ্মসচিবকে অপসারনের দাবিতে দুই দফা বিক্ষোভ করে বিএনপির পেশাজীবী সংগঠন শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ সেলিম ভুঁইয়ার নেতৃত্বে শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ শিক্ষক-কর্মচারীরা। তার বিরুদ্ধে ব্রিফকেস পেয়ে পদায়ন এবং মন্ত্রণালয়ের ঘুষ বাণিজ্য সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা ও শিক্ষা ক্যাডারের আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তাদের পুনর্বাসন করার অভিযোগ তোলে সংগঠনটি। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষাবার্তা’য় গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দে “ব্রিফকেস পেয়ে আ.লীগপন্থী শিক্ষা ক্যাডারদের পদায়ন দিচ্ছেন যুগ্মসচিব নুরুজ্জামান” শিরোনামে এবং ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দে “আ.লীগপন্থী কর্মকর্তাদের পুনর্বাসন: যুগ্মসচিব নুরুজ্জামানের প্রত্যাহারের দাবি” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের বিক্ষোভ এবং শিক্ষাবার্তা’র সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে তুমুল সমালোচনার জন্ম দিলেও তিনি বহাল তবিয়তে ছিলেন।
যুগ্মসচিব নুরুজ্জামানের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
মহা: জিয়াউল হক রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক পদে পদায়ন পান ২০২২ সালের মার্চ মাসে। সে সময়ের আওয়ামী শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের গাড়ির মধ্য থেকে এই পদে পদায়ন বাগিয়ে নেন। রাজশাহী বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক পদটি মূলত সহযোগী অধ্যাপকের। অধ্যাপক দেবাশীষ রঞ্জন রায়কে হটিয়ে এই পদে সহকারী অধ্যাপক মহা: জিয়াউল হক পদায়ন নেন। আওয়ামী আমলে পদায়নকৃত প্রায় সকল বোর্ডের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বদলি করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহা: জিয়াউল হক এখনও বহাল রয়েছেন। বহাল তবিয়তে থাকার অন্যতম কারণ তিনি প্রায় প্রতি বৃহস্পতিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যান এবং মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মোঃ নুরুজ্জামানের সাথে দেখা করেন এবং তার বাসায় উপহার সামগ্রী পাঠান। ফলে এই পদের পদায়ন/বদলির ফাইলের আর খোঁজ মেলে না।
গত বছরের ২২ অক্টোবর একযোগে যশোর শিক্ষা বোর্ডের শীর্ষ পাঁচ কর্মকর্তাকে বদলি করে পাঁচ কর্মকর্তাকে পদায়ন করা হয়। পদায়ন পাওয়া শিক্ষা ক্যাডারের পাঁচ কর্মকর্তার মধ্যে চার জন কর্মকর্তা এই পদে আসতে কেউ পাঁচ লাখ, কেউ ৮ লাখ এবং এর আশেপাশের অংকের টাকায় এই পদায়ন পান। তবে এই পাঁচ জনের মধ্যে একজনকে কোন অর্থ দিতে হয়নি। বরং তিনি এই চারজনকে একসাথে পদায়ন করান মোটা অংকের অর্থের মাধ্যমে। এই তিনি হলেন যশোর শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক সহযোগী অধ্যাপক ড. মোঃ কামরুজ্জামান। আর যার মাধ্যমে এই পদায়ন করান সেই তিনি হলেন সহযোগী অধ্যাপক ড. মোঃ কামরুজ্জামানের আপন ভাই মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মোঃ নুরুজ্জামান। যাকে শিক্ষা উপদেষ্টা এবং শিক্ষা সচিবের চেয়েও অধিক ক্ষমতাশালী বলেই চাওর শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে। এক যোগে টাকা দিয়ে পদায়ন পাওয়া ঐ চার জন হলেন, কলেজ পরিদর্শক পদে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ইনসিটু, ফুলবাড়ী সরকারি কলেজ, দিনাজপুর) অধ্যাপক এস. এম. তৌহিদুজ্জামান, উপ-কলেজ পরিদর্শক পদে ওএসডি, মাউশি ও (সংযুক্ত) সরকারি মাইকেল মধুসুদন কলেজ, যশোরের সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ রকিবুল ইসলাম, উপ-বিদ্যালয় পরিদর্শক পদে সরকারি খন্দকার মোশারফ হোসেন কলেজ, ঝিনাইদহের সহকারী অধ্যাপক মোঃ ডালিম হোসেন এবং অডিট অফিসার পদে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও (ইনসিটু) বোয়ালমারী সরকারী কলেজের সহকারী অধ্যাপক মোঃ খুরশিদ আলম মল্লিক।
শুধু যশোর শিক্ষা বোর্ডের এই পাঁচ কর্মকর্তাই নন। আওয়ামী লীগের জনপ্রশাসন মন্ত্রী (সাবেক) ফরহাদ হোসেনের একান্ত ঘনিষ্ঠজন এবং ২৪ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বিতর্কিত ভূমিকার কারণে শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে বগুড়া আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক খোন্দকার কামাল হাসানকে গত বছরের ২৯ অক্টোবর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে ওএসডি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ওএসডি থাকা অবস্থায় বিতর্কিত এই কর্মকর্তাকে গত ২ জানুয়ারি ২০২৫ খ্রি. যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে পদায়ন করানো হয়। বিতর্কিত এই কর্মকর্তাকে পদায়ন করান যুগ্মসচিব নুরুজ্জামান। তবে শিক্ষাবার্তা’সহ একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ এবং শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা ও বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হলে বিতর্কের মুখে শিক্ষা বোর্ডটিতে যোগদানের ঠিক ১০ দিনের মাথায় তাকে মাউশিতে ওএসডি করা হয়।
সম্প্রতি রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের উপ-পরিচালক (হিসাব ও নিরীক্ষা) পদে পদায়ন পান বগুড়া আজিজুল হক কলেজের সহকারী অধ্যাপক মোঃ ইব্রাহিম হোসেন। তিনি কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও হুইপ এবং জয়পুরহাট দুই আসনের সাবেক সাংসদ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপনের ডান হাত বলেই পরিচিত। মোটা অংকের অর্থের মাধ্যমে এই পদে পদায়ন বাগিয়ে নেন যুগ্মসচিবের থেকেই। বিষয়টি নিয়ে “রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের ডিডি পদে পদায়ন পেলেন আ’লীগের হুইপ স্বপনের ‘ডান হাত’!” শিরোনামে শিক্ষাবার্তা’য় সংবাদ প্রকাশিত হলে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হলেও তিনি বহাল আছেন। সপ্তাহের প্রতি বৃহস্পতিবার এই শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা মন্ত্রণালয়ে সাক্ষাৎ করেন যুগ্মসচিব নুরুজ্জামানের সাথে এবং তার বাসায় পৌঁছে দেন উপহার সামগ্রী।
শুধু এরাই নন পাঁচ আগষ্টে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যোগদানের পর একক আধিপত্য বিস্তার করে শিক্ষা প্রশাসনে যত পদায়ন হয়েছে তার ৭০ ভাগ পদায়ন হয়েছে এই যুগ্মসচিবের হাত ধরে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডসহ ৯ টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি), বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস), জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম), মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার আঞ্চলিক কার্যালয়ের পরিচালকসহ ঢাকা কলেজ, ইডেন কলেজ ও তিতুমীর কলেজ সহ রাজধানীর প্রায় সব সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষসহ শিক্ষা ক্যাডারদের পদায়ন হয় তার মাধ্যমে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সাবেক সচিব ও বর্তমান মন্ত্রীপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদের ডান হাত পরিচয় দিয়ে চলে এই পদায়ন বাণিজ্য।
জানতে চাইলে শিক্ষা ক্যাডারের ১৪তম বিএসএসের এক অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শেখ হাসিনার আমলে বিএনপিপন্থী শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা বলে আমাকে সারাজীবন মফঃস্বলের কলেজগুলোতে চাকরি করতে হয়েছে। হাসিনার পতনের পর ভেবেছিলাম এবার ভালো কোথাও পদায়ন পাব। কিন্তু মোটা অংকের টাকা দিতে পারিনি বলে পদায়ন হয়নি। যুগ্মসচিবের রুমে সব সময় এক থেকে দেরশো শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা গিয়ে বসে থাকতেন। বলা হয়ে থাকে, এই নুরুজ্জামানের ক্ষমতা উপদেষ্টার চেয়েও বেশি, যেহেতু তিনি ড. শেখ আব্দুর রশীদের ‘ডানহাত’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
শিক্ষাবার্তা’র সাথে কথা হয় অন্তত ১০ থেকে ১২ জন শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের সাথে। যুগ্মসচিব মোঃ নুরুজ্জামানের বদলিতে তারা আন্দন প্রকাশ করেন। তারা আশা করেন কোনো লবিং ছাড়া মন্ত্রণালয় এবার যোগ্য ব্যক্তিদের পদায়ন করবেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সদ্য বদলির আদেশ হওয়া যুগ্মসচিব নুরুজ্জামানের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।